মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশিত: সোমবার, অক্টোবর ৫, ২০২৬
নাগরিক সংবাদ ডেস্কঃ শিক্ষক শুধু একটি পেশার নাম নয়; শিক্ষক একটি জাতির বিবেক, জ্ঞান ও মানবিকতার নির্মাতা। একটি শিশু যখন প্রথম বিদ্যালয়ে যায়, তখন তার হাতে শুধু বই-খাতা তুলে দেওয়া হয় না, তার সামনে খুলে দেওয়া হয় একটি নতুন পৃথিবীর দরজা। সেই দরজা দিয়ে তাকে জ্ঞানের আলোয়, নৈতিকতায়, মানবিকতায় এবং স্বপ্নের পথে এগিয়ে নিয়ে যান একজন শিক্ষক। তাই শিক্ষককে সম্মান করা মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে সম্মান করা নয়; বরং জ্ঞান, শিক্ষা, সভ্যতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সম্মান করা। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল থেকে শুরু করে উপমহাদেশের আচার্য, মাওলানা, পণ্ডিত, শিক্ষক প্রত্যেক যুগেই জ্ঞান বিতরণকারী মানুষ সমাজে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছেন। আমাদের সংস্কৃতিতেও শিক্ষক ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। ‘গুরু’ শব্দটির মধ্যেই ছিল শ্রদ্ধা, আস্থা ও আলোকিত করার প্রতিশ্রুতি। শিক্ষক ছিলেন কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি ছিলেন শিষ্যের চরিত্র গঠনের পথপ্রদর্শক, নৈতিকতার শিক্ষক এবং জীবনের দিশারি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঠামো বদলেছে। শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, প্রযুক্তি এসেছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরিধি অভাবনীয়ভাবে বিস্তৃত হয়েছে। অথচ প্রশ্ন থেকে যায় এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষকের সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা কি যথাযথভাবে বেড়েছে? শিক্ষক দিবস আমাদের সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। একটি নির্দিষ্ট দিনে ফুল, শুভেচ্ছা, আলোচনা সভা, স্মারক, সম্মাননা কিংবা পদক প্রদানের মধ্য দিয়ে শিক্ষককে স্মরণ করা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু শিক্ষক দিবসের প্রকৃত সার্থকতা সেখানে নয়। একজন শিক্ষককে বছরের ৩৬৫ দিন কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তার পেশাগত নিরাপত্তা কতটুকু, তার সামাজিক মর্যাদা কেমন, তার বেতন-ভাতা তার দায়িত্বের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধা ও যোগ্যতার মূল্য কতটুকু এবং অবসরের পর তার জীবন কতটা নিরাপদ এসব প্রশ্নের উত্তরেই আসলে শিক্ষক দিবসের সার্থকতা নিহিত। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষকতার মান উন্নত না করে শিক্ষার মান উন্নত করা সম্ভব নয়। আর শিক্ষকতার মান উন্নত করতে হলে শিক্ষককে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসতে হবে। যে সমাজে মেধাবী তরুণরা শিক্ষকতাকে জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পেশা হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী হবে, সেই সমাজেই একটি শক্তিশালী জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে। বিশ্বের অনেক দেশেই শিক্ষকতা একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে বিবেচিত। কোথাও শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর প্রতিযোগিতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে, কোথাও শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো, পেশাগত উন্নয়ন ও পদোন্নতির সুস্পষ্ট পথ রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষককে শুধু ক্লাস নেওয়ার মানুষ হিসেবে দেখা হয় না; তাকে রাষ্ট্রের মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমাদেরও এই উপলব্ধিকে রাষ্ট্রীয় নীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।
শিক্ষকদের জন্য একটি পৃথক ও মর্যাদাপূর্ণ বেতন কাঠামোর বিষয়টি তাই নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। শিক্ষকতার দায়িত্ব কেবল কর্মঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন, শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন করেন, পাঠ প্রস্তুত করেন, গবেষণা করেন, সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত থাকেন, শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ও মানসিক বিকাশে ভূমিকা রাখেন এবং অনেক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরেও শিক্ষার্থীদের জন্য অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি নির্মাণ করেন। সেই দায়িত্বের গুরুত্ব কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষকই একটি শিশুর জীবনের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক। তিনি শিশুকে শুধু বর্ণমালা, সংখ্যা কিংবা পাঠ্যবই শেখান না; তিনি তাকে বিদ্যালয়মুখী করেন, শৃঙ্খলা শেখান, সহমর্মিতা শেখান, প্রশ্ন করতে শেখান, স্বপ্ন দেখতে শেখান। একটি শিশুর পরবর্তী শিক্ষাজীবনের ভিত কতটা শক্ত হবে, তার একটি বড় অংশ নির্ভর করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের ওপর। তাই শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত প্রাথমিক শিক্ষায়। মেধাবী, যোগ্য, সৃজনশীল ও মানবিক তরুণদের প্রাথমিক শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে হলে এই পেশার সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। একজন ভালো শিক্ষক তৈরি করতে যে বিনিয়োগ করা হয়, তার সুফল একটি প্রজন্ম ধরে পাওয়া যায়।বিপরীতে, অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগের ক্ষতি একটি প্রজন্মকে বহন করতে হয়।
এ কারণে শিক্ষক নিয়োগে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা, ব্যক্তিগত সুপারিশ, গোষ্ঠীগত প্রভাব কিংবা অন্য কোনো অনৈতিক প্রভাবের সুযোগ থাকা উচিত নয়। শিক্ষক হবেন মেধা, যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও মানবিকতার ভিত্তিতে নির্বাচিত। যে ব্যক্তি নিজেই মেধা ও যোগ্যতার কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষকতায় প্রবেশ করবেন, তিনিই শিক্ষার্থীদের মেধা ও যোগ্যতার মূল্য শেখাতে পারবেন।
একইভাবে পদোন্নতিও হতে হবে স্বচ্ছ, নিয়মভিত্তিক ও যোগ্যতার আলোকে। শুধু চাকরির বয়স কিংবা আনুষ্ঠানিক জ্যেষ্ঠতা নয় বরং শিক্ষাদানের মান, গবেষণা, পেশাগত দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ, শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক অবদানের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। পদোন্নতি যদি যোগ্যতার স্বীকৃতি না হয়ে অন্য কোনো প্রভাবের ফল হয়, তাহলে শিক্ষক সমাজে হতাশা তৈরি হয় এবং শিক্ষাব্যবস্থায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিক্ষকের স্বাধীনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষককে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, তার পেশাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে।
একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কতটা ন্যায়নিষ্ঠ, জ্ঞানসমৃদ্ধ, মানবিক ও দায়িত্বশীল, সেটিই হওয়া উচিত তার মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড। শিক্ষাঙ্গনকে জ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর পরিবেশে পরিণত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সবার। শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একসময় গ্রামবাংলায় একজন শিক্ষক ছিলেন সমাজের অন্যতম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। কোনো সামাজিক বিষয়ে তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হতো, মানুষ তার কাছে পরামর্শ নিতে যেত। সেই সামাজিক আস্থার জায়গাটি পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। শিক্ষককে সম্মান শুধু মুখের কথায় নয়; তার মতামত, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত জ্ঞানকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
আজকের পৃথিবীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষাব্যবস্থার সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন, প্রযুক্তি একদিন শিক্ষকের প্রয়োজন কমিয়ে দেবে। বাস্তবতা বরং ভিন্ন। প্রযুক্তি তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধ তৈরি করতে পারে না; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উত্তর দিতে পারে, কিন্তু একজন শিশুর চোখের ভাষা সবসময় বুঝতে পারে না; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পাঠ দিতে পারে, কিন্তু একজন শিক্ষকের মতো অনুপ্রেরণা, মানবিকতা ও নৈতিক দিকনির্দেশনা দিতে পারে না। ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তি যতই শক্তিশালী হোক, একজন দক্ষ ও মানবিক শিক্ষকের প্রয়োজন ততই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
তাই ভবিষ্যতের শিক্ষককে আরও বেশি দক্ষ, প্রযুক্তিবান্ধব, গবেষণামুখী ও মানবিক করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণকে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের অংশ করতে হবে। শিক্ষককে নতুন জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দিতে হবে, গবেষণায় উৎসাহিত করতে হবে এবং শ্রেণিকক্ষে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকতার পেশাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। চিকিৎসক যেমন মানুষের জীবন রক্ষা করেন, প্রকৌশলী যেমন অবকাঠামো নির্মাণ করেন, তেমনি শিক্ষক একটি জাতির মেধা ও মনন নির্মাণ করেন। রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ পেশার মতো শিক্ষকতাকেও তার দায়িত্ব ও অবদানের আলোকে মর্যাদা দিতে হবে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা শিক্ষককে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি তার ওপর। আমরা যদি মানসম্মত শিক্ষা চাই, তাহলে প্রথমেই মানসম্মত শিক্ষক চাইতে হবে। মানসম্মত শিক্ষক চাইলে মেধাবীদের শিক্ষকতায় আনতে হবে। মেধাবীদের শিক্ষকতায় আনতে হলে শিক্ষকতার সামাজিক, আর্থিক ও পেশাগত মর্যাদা বাড়াতে হবে। আর সেই মর্যাদা নিশ্চিত করতে হলে নিয়োগ থেকে পদোন্নতি পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও যোগ্যতাভিত্তিক করতে হবে। শিক্ষক দিবস তাই কেবল ক্যালেন্ডারের একটি দিন নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের আত্মজিজ্ঞাসার একটি দিন। এই দিনে আমরা শিক্ষককে ফুল দেব, শুভেচ্ছা জানাব, সম্মাননা দেব এটি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে একজন শিক্ষক সারা বছরই সম্মান নিয়ে কাজ করতে পারেন, নিশ্চিন্তে জ্ঞানচর্চা করতে পারেন, গবেষণা করতে পারেন এবং নিজের পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে গর্ব করতে পারেন। শিক্ষকের মর্যাদা আসলে একটি জাতির ভবিষ্যতের মর্যাদা। শিক্ষককে আমরা যতটা মর্যাদা দেব, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ততটাই আলোকিত হওয়ার সুযোগ পাবে। তাই শিক্ষক দিবসের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হোক, শিক্ষককে শুধু একদিন স্মরণ নয়, সারা বছর সম্মান; শুধু পদক নয়, প্রাপ্য মর্যাদা; শুধু প্রশংসা নয়, বাস্তব অধিকার; শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর রাষ্ট্রীয় নীতি।
শিক্ষক দিবসের সার্থকতা তখনই আসবে, যখন একজন মেধাবী তরুণ জীবনের লক্ষ্য হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নিয়ে গর্ব করে বলবেন ‘আমি শিক্ষক।’ আর একজন অভিভাবক সন্তানের শিক্ষককে দেখে মনে করবেন ‘এই মানুষটির হাতে আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপদ।’
সেদিনই সত্যিকার অর্থে শিক্ষক দিবস সফল হবে। কারণ একটি জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মে, আর সেই প্রজন্ম নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী কারিগর হলেন শিক্ষক।
লেখকঃ প্রফেসর ড. মোহাঃ হাছানাত আলী, উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়