বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

অনিয়েমের স্বর্গরাজ্য খুলনা বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তর

প্রকাশিত: বুধবার, আগস্ট ১২, ২০২৬

স্টাফ রিপোর্টারঃ পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার পরিচালক খোন্দকার মোঃ ফজলুলুল হকের বিরুদ্ধে অন্যায় সুবিধা নেওয়াসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। তিনি পুরো অফিসটাই অনিয়মের আখড়ায় পরিণত করেছেন। তিনি নিজেই মাসে হাতে গোনা কয়েকদিন অফিস করেন। রাত্রীযাপন করেন অফিসের লাইব্রেরীতে। ফলে বাসা ভাড়া বাবদ সরকারের বিপুল অঙ্কের অর্থ লোপাট করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এমন নানা অভিযোগের একটি কপি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। ওই অভিযোগে বলা হয়েছে, একজন পরিচালক (৪র্থ গ্রেডের কর্মকর্তা) হলেও কখনোই নিয়মিত অফিস করেন না। তিনি সাধারণত রবিবারে বিকালে আসেন এবং বুধবার অফিস শেষে চলে যান। সপ্তাহের মধ্যে এক বা দুই দিন ছুটি থাকলে সে সপ্তাহে আর আসেন না। যেমন ঈদের ছুটিতে ১১ মার্চ তারিখে অফিস ত্যাগ করে তিনি আসেন ৫ এপ্রিল তারিখে। ঈদের ছুটি এক সপ্তাহ হলেও তিনি ভোগ করেছেন তিন সপ্তাহ। এই অফিসের অন্যতম কাজ হলো জেলা কার্যালয়গুলো তদারকি করা এবং জেলা কার্যালয় গুলো হতে আসা নথি সমুহের উপর যাচাই বাছাই করে ছাড়পত্রের অনুমোদন করা। এই কাজটি সুষ্ট ভাবে করার জন্য একটি কমিটি আছে। কমিটির একটি রুপরেখা আছে। একজন উপপরিচালক (ছাড়পত্র) যিনি হবেন এই কমিটির সদস্য সচিব, পরিচালক হবেন আহবায়ক এবং বিভাগ ও জেলা পর্যায়ের উপ-পরিচালক গণ হবেন সদস্য। জেলা থেকে আগত সকল নথি বা আবেদন পরিচালক বরাবরে আসলে তিনি এই নথি যাচাই বাছাই এর জন্য সদস্য সচিবকে প্রদান করবেন। সদস্য সচিব প্রতিটি নথি যাচাই বাছাই করে একটি কার্যপত্র প্রস্তুত করে সভায় উপস্থাপন করবেন। সভায় অনুমোদিত হলে প্রতিষ্ঠান পরিবেশগত ছাড়পত্র পাবে অন্যথায় নয়। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা বিভাগে সম্পুর্ন অন্য রকম সদস্য সচিব (উপ পরিচালক ছাড়পত্র) আসিফুর রহমান তিনি কোন ফাইল ধরে দেখেন না, পরিচালক এই কাজটি করান পরিদর্শক রাজিব বাইন কে দিয়ে। যদিও পরিদর্শক ছাড়পত্র বিষয়ক কমিটির কোন সদস্যও নয়। এই রাজিব বাইনই জেলা থেকে আসা ফাইল যাচাই বাছাই করেন। জেলা কর্মকর্তাদের ফাইলের উৎকোচ আদায় করেন। কখনো নথি থেকে উদ্যোক্তাদের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে ডেকে পাঠান। যে সকল উদ্যোক্তা তার ডাকে সাড়া দেন না, তাদের ফাইলে আপত্তি দেওয়া হয়। পরিচালক এবং তার পছন্দের পরিদর্শক রাজিব বাইন ছাড়পত্র সংক্রান্ত দুর্নীতি ও হয়রানীর কাজটি করে আসছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জেলা কর্মকর্তা জানান, জেলা থেকে একজন এডি বা ডিডি যে ফাইল পাঠায়, তাতে একজন পরিদর্শক যাচাই বাছাই করে বা খবরদারী করে এটা খুবই দুঃখজনক। আবার কোন রকমে ছাড়পত্র বিষয়ক কমিটিতে কোন প্রকল্প বা ফাইল পাশ হলেও অনলাইনে অনুমোদন হয় না। এরকম অসংখ্য নথি আছে যে, নোটে বা কগজপত্রে অনুমোদন হলেও অনলাইনে অনুমোদন না হওয়ায় তারা ছাড়পত্র পাচ্ছে না। তাছাড়া মিটিং এ যেটা অনুমোদন হয় পরবর্তীতে সেটা নাকচ হয়ে যায় এরুপও নজির আছে। সভায় অন্য সদস্যরা এই সভায় পুতুল মাত্র পরিচালকের উপরে কথা বলার সাহস কারো নেই।
বিভাগীয় অধিদপ্তরের পরিদর্শক রাজিব বাইন এ বিষয়ে বলেন, পরিচালক স্যার অফিস লাইব্রেরীতে থাকেন কিনা এ বিষয়ে স্যারের সাথে কথা বললে ভাল হয়। এছাড়া কোন ফাইল আসলে উপ পরিচালক (গবেষণাগার) স্যারের কাছে যায়। সেখান থেকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার টেবিলে পৌঁছে দেই।
পরিচালকের আরেকটি বড় গুন তিনি বিভিন্ন জেলা প্রধানদের নিকট স্থানীয় বিলের টাটকা মাছ, গুড়, মধু নগদ টাকা ইত্যাদি আবদার করেন। যে সকল কর্মকর্তা তার চাহিদা মিটাতে সক্ষম হন তারা গুড বুকে থাকেন। অন্যরা পড়েন বিপাকে। তিনি বাসা ভাড়া পেলেও থাকেন পরিবেশ অধিদপ্তরের লাইব্রেরীতে। একজন উচ্ছ পদস্থ কর্মকতার জন্য এটা গ্রহনযোগ্য কিনা। অফিসে থাকলে শিল্প উদ্যোক্তাদের ডেকে এনে অফিস টাইমের বাইরে নানা রকম উৎকোচ গ্রহন করতে সুবিধা হয়। তিনি বাসা ভাড়া বাবদ মাসে ২৮,৪৮০ টাকা পেয়ে থাকেন। তিনি সে টাকা নিয়মিত নিলেও থাকেন লাইব্রেরীতে। তিনি ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর খুলনা অফিসে পরিচালক পদে যোগদান করেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক হারুন অর রশিদ বলেন, বিভাগীয় কার্যালয়ে তাদের প্রেরিত নথিপত্র যাচাই বাছাই ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ডিডি এডি যাকে খুশি তাকে দিয়ে করাতে পারেন। পরিদর্শক রাজিব বাইন এ কাজটি করেন কি না তা তিনি বলতে পারেননি। এ বিষয় নিয়ে জেলা অফিসের ক্ষোভ থাকার কথা নয় বলে তিনি জানান।
উপ পরিচালক আসিফুর রহমান বিসিএস প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা, তার পদোন্নতি না হওয়ায় নিরাপদে মাথাগুজে থাকার জন্য এই পদটি তিনি বেছে নিয়েছেন। নিজে সৎ লোক হলেও পরিচালক এর ছাড়পত্র সংক্রান্ত দুর্নীতি মেনে নিয়েছেন এবং নিজে উপস্থিত না থাকলেও অবাদে স্বাক্ষর করে হালাল করে দিচ্ছেন সব অপকর্মকে। প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা একই কর্মস্থলে কিভাবে প্রায় পাঁচ বছর অবস্থান করেন বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। তাছাড়া তিনি একজন ম্যাজিষ্ট্রেট হলেও চলতি কোন মোবাইল কোর্ট করেছেন কি না তা কেউ বলতে পারেননি।
উপ পরিচালক প্রশাসন সিরাজুল ইসলাম মাসে দু’বার এসে তিন থেকে চার দিন অফিস করে চলে যান। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমি নিয়মিত অফিস করি। তবে অধিকাংশ সময় ট্রেনিং এ থাকি।
উপ পরিচালক সরদার শরীফুল ইসলাম (এনফোর্সমেন্ট ও মনিটরিং)। তিনি কক্সবাজারের পাহাড় কর্তনকারীরা তাকে বাঘের মত ভয় পায়। তিনি পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ মামলার বাদী ও তদন্তকারী কর্মকর্তা।
অভিযোগ রয়েছে, উপ পরিচালক গবেষনাগার মিহির লাল সরদার সময় কাটাতে অফিসে আসেন। তার সময়ে গবেষনাগারে তেমন কোন উন্নতি হয়নি। বিগত সরকারের আমলে তার অবস্থান ছিল বিতর্কিত।
সরদার শরিফুল ইসলাম বলেন, এনফোর্সমেন্ট ও মনিটরিং-এর কাজ করতে হলে ম্যাজিষ্ট্রেসি ক্ষমতা থাকলে কাজ করতে সুবিধা হয়।
উপ পরিচালক আসিফুর রহমান বলেন, পরিচালক সাহেব ঠিকমত অফিস করেন কি না সে ব্যাপারে মন্তব্য করতে চাননি। তবে পরিদর্শক রাজিব বাইন নিয়মের বাইরে গিয়ে নথিপত্র যাচাই বাচাই করছে এটা ঠিক নয় বলে তিনি দাবী করেন।
খুলনা বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক খোন্দকার মোঃ ফজলুল হক বলেন, আমি মাঝে মধ্যে অফিসে থাকি। তাছাড়া আমাদের কোন নৈশ প্রহরী নেই। রাতে মানুষজন থাকলে চোরের উপদ্রব হয় না। অফিসের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর তিনি এড়িয়ে যান এবং পরে ফোনে কথা হলে সাংবাদিক পরিচয়ে পেয়ে কল কেটে দেন। এভাবে একাধিকবার কল করা হলেও আর রিসিভ করেননি।

অন্যদের সাথে শেয়ার করুন

আরো পড়ুন