রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬
প্রকাশিত: শনিবার, জুলাই ৪, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্টারঃ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বিভাগীয় সিটি কর্পোরেশন খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) দীর্ঘদিন ধরে নগর সেবার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে প্রবীণ রাজনীতিবিদ নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
সম্প্রতি কেসিসিতে অবসর-উত্তর ছুটিতে (পিআরএল/এলপিআর) যাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাপ্তরিক কাজে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সূত্র বলছে, সম্প্রতি অবসর-উত্তর ছুটিতে গমন করা কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী বিনা বেতনে কেসিসির দাপ্তরিক কাজে অংশগ্রহণের অনুমোদন চেয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ প্রশাসকের কাছেও আবেদন করেছেন।
এমন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন নিম্নমান সহকারী শাহ মো. আল সানী। তিনি ১৯৯৭ সালের ২৯ মে চাকরিতে যোগদান করেন এবং ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর অবসর-উত্তর ছুটিতে যান। অভিযোগ রয়েছে, এলপিআরে যাওয়ার পরও তিনি কেসিসি প্রশাসকের পিএ হিসেবে দাপ্তরিক কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার মহলে তার প্রভাব রয়েছে। পালয়নকৃত সাবেক মেয়রের সময় ‘ছায়া মেয়র’ খ্যাত গোপাল চন্দ্র সাহার অন্যতম সহযোগি ছিলেন, জাহিদ, সানি, হাকিম ও সুজন। একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, এখনো সেই বলয় সক্রিয় রয়েছে। ফাইল অগ্রগামি করতে দিতে হয় কমিশন। না দিলে নড়ে না ফাইল।
একইভাবে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা এসকেএম তাছাদুজ্জামান ২০২৬ সালের ৯ মার্চ এলপিআরে যান। তিনি ১৯৯৭ সালের ২৪ মে একই পদে যোগদান করেছিলেন। অন্যদিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোল্লা মারুফ রশীদ ২০২৬ সালের ৪ জুন এলপিআরে যান। তিনি ২০০৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মোল্লা মারুফ রশীদ এলপিআরে যাওয়ার একদিন আগে প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। আবেদনে তিনি অবসর-উত্তর ছুটিকালীন সময়ে কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা বা পারিশ্রমিক ছাড়াই দাপ্তরিক কাজে অংশগ্রহণের অনুমতি চান।
বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে কেসিসি প্রশাসন জুন মাসের ৮ তারিখে স্থানীয় সরকার বিভাগ-এর সচিবের কাছে মতামত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। এখন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে কেসিসি। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২/২/২০২১ তারিখের ০৭,০০,০০০০,১৭১,১৩,০০৬,১৩-২২ নং স্মারকের দেখা যায় পিআরএল -এ থাকা অবস্থায় নিয়মিত কর্মক্ষেত্রে গিয়ে অফিস করার কোনো সুযোগ নেই। পিআরএল হলো মূলত অবসরের পরের ছুটি। পিআরএল শুরুর দিন থেকেই প্রকৃতপক্ষে কর্মীর চাকরি জীবনের সমাপ্তি ঘটে এবং পদটি শূন্য বলে গণ্য হয়। এই সময়ে অফিসে উপস্থিত থাকার বিধান নেই। তাই এবিষয়ে কেসিসি ‘র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর ব্যাপারটি নিয়ে আইনগত প্রশ্ন এখন জনমনে।
কেসিসি’র হিসাব বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রে জানা যায়, অবসরপ্রাপ্ত মারুফ রশিদ, এস এম তাছাদুজ্জামান ও শাহ মো. আল সানী আবেদন করে অবসরের সকল সুবিধা ভোগ করছেন। এই অবস্থায় এই অবসরপ্রাপ্তদের যেকোনো পদে বা নামে কাজ করার সুযোগ দিলে তা দেশের আইনের লংঘন ও পরবর্তীতে অডিট আপত্তি হতে পারে। প্রশাসকের দপ্তরে আইন না মেনে কর্মরত অবসরপ্রাপ্ত ব্যাক্তিকে ভিন্ন পদের নামে কাজ করার বিষয়ে প্রচার রয়েছে।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাড. কুদরত-ই-খুদা বলেন, কোন প্রতিষ্ঠানে যদি লোকবল প্রয়োজন হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান নীতিমালা অনুসরণ করে লোকবল নিয়োগ দিতে পারে। তবে অবসরে যাওয়া কোন ব্যক্তি বিনা বেতনে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করা মানে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। যা সুশাসনের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
নগর প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদি অবসর-উত্তর ছুটিতে থাকা ব্যক্তিদের দাপ্তরিক কাজে সম্পৃক্ত করা হয়, তাহলে তার আইনি ভিত্তি, দায়িত্বের পরিধি এবং জবাবদিহিতার কাঠামো কী হবে, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। এছাড়া সবাই যদি এলপিআরে গিয়ে আবেদন করতে থাকে তাহলে এক সময় বড় ধরণের জটিলতায় পড়তে হতে পারে কেসিসিকে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে কেসিসির সচিব মো. রেজা রশিদ (উপসচিব) বলেন, এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের মতামত চাওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নগর প্রতিষ্ঠানে অবসর-উত্তর ছুটিতে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুনরায় দাপ্তরিক কাজে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ একদিকে অভিজ্ঞতা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে প্রশাসনিক ও আইনি প্রশ্নও উত্থাপন করছে। এখন মন্ত্রণালয়ের মতামত এবং কেসিসির পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল। জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন, কি মধু সিটি কর্পোরেশনে, কেন বেতন ছাড়াই কাজ করতে চায় অবসর-উত্তর ছুটিতে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, এ বিষয়ে মতামতের জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে মতামত আসলে তার ভিত্তিতেই পরবর্তী কার্যক্রম হাতে নেব আমরা। আর অবসরকালিন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া দাপ্তরিক কাজ করার কোন সুযোগ নেই।